সম্মানিত সুধী ____________

      “এসো হে বৈশাখ, এসো এসো..।” বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম মাস, বাঙালি জীবনের আনন্দ বিভাস। বৈশাখ আসে নতুন আশার আলো নিয়ে। দেশ ছেড়ে প্রবাসে আমরা। বৈশাখকে বরণ করে নিতে আয়োজন করতে যাচ্ছি রোদ্দুর বৈশাখী।

     আসছে ১১ বৈশাখ, ১৪২১ বঙ্গাব্দ; ২৫ এপ্রিল, শুক্রবার; দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা।

সাদর নিমন্ত্রণ আপনাকে / সপরিবারে।  ধন্যবাদ ও বৈশাখী শুভেচ্ছা সহকারে -

আবুল বাশার বুলবুল ও কাজী নিয়ামুল বশীর।

 

দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিখণ্ডিত শাহবাগ অনেক বেশি শঙ্কার, অনেক বেশি উদ্বেগের।
দ্বিখণ্ডিত বাংলাদেশের একটি ব্যাখ্যা বিভিন্ন মহল থেকে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বাংলাদেশ আর মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের বাংলাদেশ। ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বাংলাদেশ আর ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বিপক্ষের বাংলাদেশ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাংলাদেশ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষের বাংলাদেশ। যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষের বাংলাদেশ আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিপক্ষের বাংলাদেশ।
জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। তরুণ প্রজন্ম তা মানতে পারেনি। তারা ছুটে এসেছিল শাহবাগে। প্রতিষ্ঠা করেছিল গণজাগরণ মঞ্চ। এই আন্দোলনে কোনো নেতা ছিলেন না, কোনো একক সংগঠন এর উদ্যোগ নেয়নি। এই আন্দোলনে যেমন তরুণ ব্লগাররা ছিলেন, তেমনি ছিলেন প্রগতিশীল সব ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা। তার চেয়েও বেশি ছিলেন সাধারণ মানুষ, ছাত্র-তরুণেরাও এসেছিল। সেদিন সবার কণ্ঠে একটি দাবি উচ্চারিত হয়েছিল—যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
এর পর আমরা দেখলাম শাহবাগের সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল দেশময়, প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে গড়ে উঠল গণজাগরণ মঞ্চ। কয়েকটি স্থানে প্রতিপক্ষ হামলাও চালাল। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা ছিলেন অকুতোভয়। এমনকি দেশের বাইরে যেখানে বাংলাদেশের মানুষ আছেন, তাঁদের মধ্যেও এই আন্দোলন সাড়া জাগায়। অন্য সব রাজনৈতিক ও পেশাজীবী আন্দোলন থেকে এর চরিত্র ছিল ভিন্ন। রাজনৈতিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য থাকে ক্ষমতায় যাওয়া। পেশাজীবীদের আন্দোলনের লক্ষ্য থাকে দাবিদাওয়া পূরণ। কিন্তু শাহবাগের আন্দোলনের মধ্যে মানুষ কেবল দাবি পূরণ নয়, তার স্বপ্ন ও ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিল। একে তারা আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেছিল। শাহবাগ হয়ে উঠেছিল মুক্তচিন্তার মানুষের ঠিকানা ও আশ্রয়।
এই আন্দোলনে কেবল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, সংস্কৃতিসেবীরাই অংশ নেননি; অসংখ্য শিশুর পাশাপাশি এর সঙ্গে লাখ লাখ সাধারণ নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ, তরুণেরা সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। যাঁরা কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমনকি নিজেদের প্রথাগত সংস্কৃতিসেবীও মনে করতেন না, তাঁরাও ছুটে এসেছিলেন শাহবাগের পিচঢালা চত্বরে। জামায়াতের নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিচারের বিষয়টি সামনে ছিল ঠিকই কিন্তু তাঁরা চেয়েছিলেন আরও বেশি কিছু। তাঁরা চেয়েছিলেন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে একাত্তরের চেতনায়, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে।
আমাদের দেশের প্রচলিত আন্দোলনগুলো গড়ে ওঠে নেতাদের নির্দেশে, দলের উদ্যোগে। এখানে ছাত্র ও শিক্ষকেরা এসেছেন শ্রেণীকক্ষ থেকে, পেশাজীবীরা এসেছেন নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে। একাত্তরের মার্চের সেই অবিস্মরণীয় আন্দোলনের পর এ রকম স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ আর ঘটেনি। এই আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণাকে ভেঙে দিয়ে নতুন চেতনা সঞ্চারিত করেছিল মানুষের মনে; যে চেতনা দলীয় ও গোষ্ঠীগত বৃত্তের বাইরে। এই আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে যেমন সমস্যা হয়, নানা জটিলতা দেখা দেয়, এখানেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মানুষের অন্তরের ঠিকানা হয়ে উঠেছিল শাহবাগ।
আজ মাত্র ১৪ মাসের ব্যবধানে সেই গণজাগরণ মঞ্চের বিভক্তি এবং মারামারি দেখে আমরা ব্যথিত ও লজ্জিত হই। শঙ্কিত হই। আশাহত হই। শাহবাগকে যখন বিভক্ত ও দ্বিখণ্ডিত হতে দেখি, যখন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের আহত ও রক্তাক্ত হতে দেখি, তখন আমরা এর মধ্যে নিছক একটি সংগঠনের মৃত্যু দেখি না, দেখি মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু। ভালোবাসার মৃত্যু। এতে তারাই আশকারা পাবে, যারা এক বছর আগে শাহবাগকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করত, যারা নাস্তিক বলে গালমন্দ করত। বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালাত। এতে তাদের হাতই শক্তিশালী হবে, যারা সেদিন লাখো কণ্ঠের বজ্রনিনাদে ভীত-শঙ্কিত ছিল।
গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি সংসদে থাকলেও তাঁর মন ছুটে যেতে চায় শাহবাগে। আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা—এখন কি তাঁর মন শাহবাগে ছুটে যেতে চায় না? আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতাদের কাছেও প্রশ্ন রাখতে চাই—যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ গঠিত হয়েছিল, তার সবটাই কি পূরণ হয়েছে?
যদি না হয়ে থাকে, তাহলে কেন এক পক্ষ গণজাগরণ মঞ্চের যবনিকা টানতে চাইছেন?
কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে গণজাগরণ মঞ্চ শাহবাগে সমবেত হলেও পরবর্তীকালে এই আন্দোলন আরও ব্যাপ্তি পায়। যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি গণজাগরণ মঞ্চ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবি সামনে নিয়ে আসে। এসব দাবি কি পূরণ হয়ে গেছে? না, হয়নি। তাহলে কেন গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার জন্য মহলবিশেষ মরিয়া হয়ে উঠল?
এ কথা মনে রাখা দরকার, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো গণজাগরণ মঞ্চ কোনো দলের বা গোষ্ঠীর নয়। এই মঞ্চ ছিল বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার সব মানুষের। সব তরুণের। জামায়াত-শিবির ও হেফাজতিদের আক্রমণের মুখেও যে গণজাগরণ মঞ্চ অসীম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে, মাসের পর মাস শান্তিপূর্ণ ও অহিংস কর্মসূচি পালন করে গেছে, সেই জাগরণ মঞ্চের কর্মীরা নিজেরা মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছেন, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ইমরান এইচ সরকারকে এই আন্দোলনের মুখপাত্র করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে মঞ্চের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর আপত্তি থাকলে সবার মতামতের ভিত্তিতে অন্য একজনকে মুখপাত্র করা যেত। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চটি বন্ধ করে দেওয়ার যুক্তি দেখি না।
ক্ষমতাসীনেরা নিশ্চয়ই জানেন, শাহবাগ দুর্বল হওয়া বা দ্বিখণ্ডিত হওয়ার অর্থ স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি, অর্থাৎ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ এত দিন যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, তারা শক্তিশালী হবে। একদিকে শাহবাগে বিভক্তি এবং হেফাজতে ইসলামের আমিরের কণ্ঠে সরকারের প্রতি মৈত্রীর আহ্বান আমাদের শঙ্কা ও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে নবজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা কামাল পাশা চৌধুরী দাবি করেছেন, গণজাগরণ মঞ্চের বিভক্তির মূল কারণ আদর্শিক। তিনি কোন আদর্শের কথা বলছেন, তা পরিষ্কার নয়। আমরা যতটা জানি, গণজাগরণ মঞ্চের সবাই যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সমবেত হয়েছিলেন। সেই দাবি থেকে কেউ বিচ্যুত হয়েছেন, তা আমাদের জানা নেই। কামাল পাশা চৌধুরী আরও বলেছেন, যেদিন জাতীয় সংসদে আপিলের সমান সুযোগ পেল, ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন করা হলো, সেদিনই উচিত ছিল সমাবেশটা ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলা। সেদিন তাঁরা কেন সিদ্ধান্ত নিলেন না?
তিনি এও বলেছিলেন যে তাঁদের সন্দেহ ইমরান এইচ সরকার আদর্শ থেকে সরে গিয়ে ওটাকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা মহল চেষ্টা করছে। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে নিয়ে যাওয়া বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন? ইমরান এইচ সরকার কি যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করছেন? একদিকে কামাল পাশা বলছেন, সংসদে আইন পাসের পরই আন্দোলন গুটিয়ে ফেলা উচিত ছিল, আরেক দিকে বলছেন, আন্দোলনটাকে এগিয়ে নিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন প্রয়োজন। জনগণ কোনটি বিশ্বাস করবে?
অন্যদিকে ইমরান এইচ সরকার গণজাগরণ মঞ্চকে এখনো এক রাখতে চান। তিনি বলেছেন, ‘আমি এটিকে বিভক্তি হিসেবে দেখছি না। বলতে পারেন মতপার্থক্য।’ দেখা গেছে, কর্মসূচি নেওয়ার পর যে কঠোর কর্মসূচি চেয়েছে, তারও পছন্দ হয়নি, যে শিথিল কর্মসূচি চেয়েছে, তারও পছন্দ হয়নি। তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া জটিল ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শ বা কৌশলের সঙ্গে সাধারণ মানুষ বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পার্থক্য তৈরি হয়। যেকোনো সংগঠনে মতভেদ থাকবে। নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো, সেসব আমলে নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে মারামারি, লাঠালাঠি হবে কেন? কেন এক পক্ষ অরেক পক্ষের ওপর চড়াও হবে? এটি তো কোনো আদর্শিক সংগঠনের কাজ হতে পারে না।
গত সেপ্টেম্বরে দিল্লির জওহরলাল ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞানের এক অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপ হতেই শাহবাগের গণজাগরণ সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, তোমরা কীভাবে এ রকম একটি গণজাগরণ সৃষ্টি করলে? উপমহাদেশের এ ধরনের আন্দোলনের নজির নেই। মিসরের তাহরির স্কয়ার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে যে আন্দোলন হয়েছে, তার চেয়ে বাংলাদেশের আন্দোলন অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আগের দুটোই রাজনৈতিক আন্দোলন। আর বাংলাদেশে যে আন্দোলন হয়েছে, সেটি আত্মজাগরণ ও আত্মমুক্তির আন্দোলন। তিনি বাংলাভাষী নন। বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, তা-ও নয়।
সেই অধ্যাপকের সঙ্গে যদি এখন দেখা হয়, তাঁর কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে বলব, মহাত্মন, আপনি যেভাবে বলেছেন, আমরাও সেভাবে ভেবেছিলাম। কিন্তু আমাদের ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতি সেটিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। এখানে সম্ভবত আর কোনো জাগরণ সম্ভব নয়। না আত্মশুদ্ধির, না আত্মশক্তির।
যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তা পালন করি না; ভূরিপরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি; তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না;... পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্, এবং নিজের বাক্চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। [সূত্র: চারিত্রপূজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]
মনে হয় শত বছর আগে কবি বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশেই এ বাক্যটি লিখে গিয়েছিলেন। গণজাগরণ মঞ্চ যাঁরা ভেঙে দিতে চান, তাঁদের একবার আয়নায় নিজের মুখ দেখতে বলব। এক বছর আগে কী বলেছিলেন, মনে করে দেখুন।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।

চারদিকে আজ সাজ সাজ রব। লাল-সাদা পোশাকের সমাহার। বাজছে ঢোল, ডুগডুগি। পথে পথে ভেঁপু। সারা বাংলা ভেসেছে বিপুল উচ্ছ্বাসে। ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণী-পেশা, বয়সনির্বিশেষে সব মানুষ শামিল হয়েছেন বৈশাখী উত্সবে। ভেদাভেদ ভুলে উত্সবের রঙে ১৪২১ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিয়েছে বাঙালি।রাজধানীর রমনার বটতলায় আজ সোমবার ভোর ছয়টার কিছু পর ছায়ানট আয়োজন করে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। এবার তাদের অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ‘স্বদেশ ও সম্প্রীতি’।
ভোর থেকেই রাজধানীর পথে পথে নেমেছে উত্সবমুখর নগরবাসীর ঢল। চারুকলা, রমনা, টিএসসি লোকে লোকারণ্য। নারীদের পরনে সুতির শাড়ি। হাতে কাচের চুড়ি। কবরীতে তাজা ফুলের মালা। পুরুষদের রঙিন পাঞ্জাবি।
পথের পাশে বসেছে লোকজ খেলনা, কারুপণ্যের পসরা। চলছে কেনাকাটা।
প্রকৃতিও সেজেছে নবরূপে। গাছে গাছে নতুন পাতা। চকচক করছে প্রখর রোদে।
সকাল সোয়া নয়টার পর চারুকলা অনুষদ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। নববর্ষের প্রধান বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের এবারের স্লোগান ‘জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে’।
শিশুপার্কের সামনে নারকেলবীথি চত্বরে সকালে রয়েছে ঋষিজের গানের অনুষ্ঠান। ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে ধানমন্ডি ক্লাবের আয়োজনে বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠান শুরু হবে ভোর ছয়টায়।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ধানমন্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে গতকাল থেকেই শুরু হয়েছে তিন দিনের অনুষ্ঠান। সুরের ধারার আয়োজনে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে গানের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে গতকাল, আজ সকালে সহস্র কণ্ঠের গানে গানে আবাহন জানানো হয়েছে নতুন বছরকে। ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় ‘আমাদের বাংলা শোভাযাত্রা’ শীর্ষক মঙ্গল শোভাযাত্রা করছে ইউডা।
শিল্পকলা একাডেমিতে তাদের প্রাঙ্গণে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হবে সন্ধ্যায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের মঙ্গল শোভাযাত্রা সকাল সাড়ে নয়টায়।
সারগাম ললিতকলা একাডেমির আয়োজনে গানের অনুষ্ঠান সকাল আটটায় ধানমন্ডি লেকের পাশে। জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সকাল নয়টা থেকে শুরু হবে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সঙ্গে থাকবে বিশেষ ভোজ। বৈশাখী মেলা শুরু হবে বিসিক ও বাংলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে একাডেমি প্রাঙ্গণে, মেলা চলবে ১০ দিন।
ঐতিহাসিকদের মতে, বৈদিক যুগে বাংলা সনের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। সম্রাট আকবর ফসলি সন হিসেবে বৈশাখ মাসকে প্রথম ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় প্রথম খাজনা আদায় করা শুরু করেন নবাব মুর্শিদকুলি খান। জমিদারি আমলে পয়লা বৈশাখের প্রধান আয়োজন ছিল খাজনা আদায় উপলক্ষে ‘রাজপুণ্যাহ’ ও ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’। জমিদারি প্রথা বিলোপের পর ‘রাজপুণ্যাহ’ লুপ্ত হয়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেনেও আসে পরিবর্তন। হালখাতাও জৌলুস হারিয়ে ফেলে। ইদানীং নাগরিক জীবনে যে সাংস্কৃতিক চেতনায় পয়লা বৈশাখের উত্সব হচ্ছে, তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনিই প্রথম শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উত্সবের আয়োজন করেন। এর অংশ হিসেবে বৈশাখ বরণের উত্সবের জন্য বাংলা নতুন বছরকে সম্ভাষণ জানিয়ে রচনা করেছেন বহু কালজয়ী সংগীত ও কবিতা। বাঙালির কণ্ঠে আজ ছড়িয়ে যাবে সেই চেনা সুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো...’।
আধুনিক জীবনযাত্রার নানাবিধ প্রয়োজনে সব ক্ষেত্রে বাংলা সনের অনুসরণ এখন আর সম্ভব না হলেও নিজের বর্ষপঞ্জিটি নিয়ে বাঙালির রয়েছে বিশেষ গৌরব। পয়লা বৈশাখ নেহাত একটি বছরের শুরুর দিন নয় বাংলাভাষীদের কাছে। এটি এই জনপদের মানুষের সুদীর্ঘকালের আপন সাংস্কৃতিক চেতনা ও ঐতিহ্যের স্মারক। আপন জাতিসত্তায় অনুপ্রাণিত হওয়ার উত্স। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যবোধে দীপ্ত হওয়ার উপলক্ষও। এ কারণেই এই উত্সবের গুরুত্ব দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিণত হয়েছে বাঙালি জাতির জীবনে এক মহত্ উত্সব হিসেবে।